ডিম্বাশয়ের সিস্ট (Ovarian cyst)

শেয়ার করুন

বর্ণনা

ডিম্বাশয়ের উপরিভাগে বা ভিতরে তরলপূর্ণ থলে বা পকেটের মত কিছু দেখা দিলে তাকে ডিম্বাশয়ের সিস্ট বলে। জরায়ুর দুই পাশে একটি করে মোট দুইটি ডিম্বাশয় থাকে। এই ডিম্বাশয়গুলো দেখতে কাজু বাদামের মত বড় হয়। ডিম্বাশয়ের ভেতরে ডিম্বানু তৈরী হয় এবং প্রত্যেক মাসে একটি নির্দিষ্ট সময়ে এই ডিম্বানু ডিম্বাশয় থেকে বের হয়ে আসে যা সন্তান ধারণের জন্য অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি পর্যায়।

অনেক মহিলারই জীবনের কোনো না কোনো সময় ডিম্বাশয়ে সিস্ট দেখা দেয়। বেশিরভাগ সিস্টই ক্ষতিকর নয় এবং তেমন কোন সমস্যার সৃষ্টি করে না। বেশিরভাগ ডিম্বাশয়ের সিস্ট কোনো ধরণের চিকিৎসা ছাড়াই কয়েক মাসের মধ্যেই ভালো হয়ে যায়।

কিন্তু ডিম্বাশয়ের যে সিস্টগুলো ফেটে যায় ও ছড়িয়ে পড়ে তা ক্ষতিকর হয়ে থাকে এবং এর ফলে কখনও কখনও মারাত্মক সমস্যার সৃষ্টি হয়। এ সমস্যা প্রতিরোধ করতে অবশ্যই ক্ষতিকর লক্ষণগুলো সম্পর্কে জানতে হবে এবং নিয়মিত পেলভিস (Pelvis) পরীক্ষা করানোর জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

কারণ

স্বভাবতই মেয়েদের যে মাসিক বা ঋতুস্রাব হয় তার জন্য বেশিরভাগ ডিম্বাশয়ের সিস্ট হয়ে থাকে। এই ধরণের সিস্টকে বলা হয় ফাংশনাল সিস্ট (Functional cyst)। ডিম্বাশয়ে অন্যান্য ধরণের সিস্ট খুব কম হয়ে থাকে।

ফাংশনাল সিস্ট (Functional cyst) :

সাধারণত প্রত্যেক মাসে মেয়েদের ডিম্বাশয়ে সিস্টের মত ফলিকলস (Follicles- ক্ষুদ্র গুটি বা থলে) তৈরী হয়। এই ফলিকলসের কাজ হল এস্ট্রোজেন ও প্রোজেসটেরন নামক হরমোন তৈরী করা এবং তৈরী হওয়া ডিম্বানু ডিম্বাশয় থেকে বের করে দেওয়া। কখনও কখনও এই ফলিকলসগুলো বড় হতে থাকে এবং এক পর্যায়ে তা ফাংশানাল সিস্টে রূপান্তরিত হয়। ফাংশনাল সিস্ট দুই ধরণের হয়ে থাকে। যেমনঃ

  • ফলিকুলার সিস্ট (Follicular cyst) : মাসিকের মাঝামাঝি সময়ে একটি ডিম্বানু ফলিকল থেকে বেরিয়ে ফেলোপিয়ান টিউবে (Fallopian tube) এসে পৌঁছায় এবং শুক্রানুর জন্য প্রস্তুত হয় নিষেক প্রক্রিয়া শুরু করার জন্য। এই প্রক্রিয়ায় কোনো সমস্যা দেখা দিলে ডিম্বানু ফলিকল থেকে বের হতে পারে না এবং তা সিস্টে পরিণত হয়।
  • কারপাস লুটেয়াম সিস্ট (Corpus luteum cyst) : একটি ফলিকল থেকে ডিম্বানু বেরিয়ে আসলে, নিষেকের জন্য ঐ ফলিকল হতে প্রচুর পরিমাণে এস্ট্রোজেন ও প্রোজেসটেরন তৈরী হতে শুরু করে। এই ফলিকলকে বলা হয় কারপাস লুটেয়াম বা Corpus luteum। কখনও কখনও ডিম্বানু নিষিক্তকরণের এই প্রক্রিয়া বাধাপ্রাপ্ত হলে ফলিকলে তরল জমতে শুরু করে এবং কারপাস লুটেয়াম একটি সিস্টে পরিণত হয়।

ডিম্বাণু উৎপাদনের জন্য যেসকল উর্বরতা বৃদ্ধিকারী ঔষধ ব্যবহার করা হয় তা কারপাস লুটেয়াম সিস্টের ঝুঁকি বাড়ায়। তবে এ ধরণের সিস্ট সন্তান ধারনের জন্য বা গর্ভাবস্থায় কোনো রকম সমস্যার সৃষ্টি করে না।

ফাংশানাল সিস্ট সাধারণত ক্ষতিকর হয় না এবং এগুলো প্রায়ই দুই তিনটি মাসিকের পর নিজে নিজেই ভালো হয়ে যায়।

অন্যান্য সিস্টঃ

কিছু কিছু সিস্ট মেয়েদের স্বাভাবিক মাসিকের সাথে সম্পর্কিত। এই ধরণের সিস্টগুলো হলঃ

  • ডার্মোয়িড সিস্ট (Dermoid cyst) : এ ধরনের সিস্টে ত্বক ও লোম এর টিস্যুর মতো উপাদান দেখা যায়। এ সিস্টগুলো খুব কমই ক্যান্সার আক্রান্ত হয়।
  • সিস্টাডেনোমাস (Cystadenomas) : এ ধরণের সিস্ট ডিম্বাশয়ের টিস্যু থেকে হয়ে থাকে এবং এগুলো পানি বা শ্লেষ্মার মত পদার্থ দিয়ে পূর্ণ থাকে।
  • এন্ডোমেট্রিয়োমাস (Endometriomas) : জরায়ুর বাইরে ইউটেরাইন এন্ডোমেট্রিয়াল কোষ দেখা দিলে তাকে এন্ডোমেট্রিয়োসিস (Endometriosis) বলে। এন্ডোমেট্রিয়োসিসের জন্য এ ধরণের সিস্ট হয়ে থাকে।

ডার্মোয়িড সিস্ট ও  সিস্টাডেনোমা আকারে বৃদ্ধি পেতে পারে ও বড় হতে পারে এবং ডিম্বাশয় Pelvis এ স্বাভাবিক অবস্থান থেকে সরে যায়। যার ফলে ডিম্বাশয়ে ব্যাথা হতে পারে। এটি অভারিয়ান টরশন (Ovarian torsion) নামে পরিচিত।

লক্ষণ

এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে চিকিৎসকেরা নিম্নলিখিত লক্ষণগুলি চিহ্নিত করে থাকেন:

চিকিৎসা

 চিকিৎসকেরা এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের নিম্নলিখিত ঔষধগুলি গ্রহণ করার পরামর্শ দিয়ে থাকেন:

diclofenac sodium ibuprofen
indomethacin ketorolac
morphine sulphate naproxen

চিকিৎসকেরা এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের নিম্নলিখিত টেস্টগুলি করার পরামর্শ দিয়ে থাকেন:

প্রেগনেন্সি টেস্ট, ইউরিন (Pregnancy test, Urine)
সি-বি-সি (কমপ্লিট ব্লাড কাউন্ট) (CBC, Complete Blood Count)
সি-এ-১২৫ (CA-125)
ইউ-এস-জি-এল/এ (USG L/A)
ইউরিন এনালাইসিস (Urinalysis)
সারভাইকাল সোয়াব সি/এস (Cervical swab c/s)
সারভাইকাল সোয়াব গ্রাম স্টেইন (Cervical swab gram stain)
কালডোসেন্টেসিস (Culdocentesis)

ঝুঁকিপূর্ণ বিষয়

যেসকল বিষয় বা উপাদান একজন ব্যক্তির কোনো রোগ দ্বারা আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনাকে প্রভাবিত করে তাকে ঐ রোগের ঝুঁকিপূর্ণ বিষয় বলে। ভিন্ন ভিন্ন ক্যান্সারের ঝুঁকিপূর্ণ বিষয় ভিন্ন ভিন্ন হয়ে থাকে। যেমনঃ সরাসরি সূর্যের আলোতে গেলে স্কিন ক্যান্সারের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়। আবার ধূমপান ফুসফুস ক্যান্সারের ঝুঁকি বৃদ্ধি করে।

তবে এক বা একাধিক ঝুঁকিপূর্ণ বিষয় এটি নিশ্চিত করে না যে, কোনো ব্যক্তি ঐ রোগ দ্বারাই আক্রান্ত হবে। কোনো মহিলার ডিম্বাশয়ে ক্যান্সার দেখা দিলে, কোন ঝুঁকিপূর্ণ বিষয় ঐ ক্যান্সার হওয়ার ক্ষেত্রে কতটুকু সক্রিয় ছিল তা নির্দিষ্ট করে বলা যায় না।

ডিম্বাশয়ের সিস্টের ক্ষেত্রে ঝুঁকিপূর্ণ বিষয়গুলো হলঃ

  • বয়স
  • অতিরিক্ত ওজন
  • প্রজনন সংক্রান্ত সমস্যা
  • জন্ম বিরতিকরণ পদ্ধতির ব্যবহার।
  • কোনো স্ত্রীরোগের জন্য অপারেশন করা হলে।
  • উর্বরতা বৃদ্ধির জন্য ঔষধের ব্যবহার।
  • এন্ড্রোজেন
  • হরমোন থেরাপি ও এস্ট্রোজেন থেরাপি।
  • পরিবারে অন্য কোনো সদস্যের ডিম্বাশয়ের ক্যান্সার, ব্রেস্ট ক্যান্সার বা কলোরেক্টাল (Colorectral) ক্যান্সার থাকলে।
  • পরিবারে অন্য কোনো সদস্যের ক্যান্সার থাকলে।
  • বংশগত কারণে ব্রেস্ট ক্যান্সার ও ডিম্বাশয়ের ক্যান্সার থাকলে।
  • বংশগত কারণে নন-পলিপোসিস (nonpolyposis) কোলন ক্যান্সার হলে।
  • ব্রেস্ট ক্যান্সার
  • ট্যালকম পাউডারের ব্যবহার।
  • অস্বাভাবিক খাদ্যাভাস।
  • ধূমপান ও মদ্যপান।
  • ব্যথানাশক ঔষধের ব্যবহার

যারা ঝুঁকির মধ্যে আছে

লিঙ্গঃ মহিলাদের মধ্যে এই রোগ নির্ণয়ের গড়পড়তা সম্ভাবনা রয়েছে।

জাতিঃ শ্বেতাঙ্গ, কৃষ্ণাঙ্গ ও হিস্প্যানিকদের মধ্যে এই রোগ নির্ণয়ের গড়পড়তা সম্ভাবনা রয়েছে। অন্যান্য জাতির মধ্যে এই রোগ নির্ণয়ের সম্ভাবনা ১ গুণ কম।

সাধারণ জিজ্ঞাসা

উত্তর: ডিম্বাশয়ে সিস্ট হওয়া খুব সাধারণ ও স্বাভাবিক এবং এটি Pelvis পরীক্ষা বা আল্ট্রাসাউন্ডের সাহায্যে সনাক্ত করা যায় এবং পরবর্তী টেস্টের আগেই এটি নিজে নিজেই ভালো হয়ে যায়। তবে যে সিস্টগুলো নিজে নিজে ভালো হয় না সেগুলোর জন্য যথাযথ চিকিৎসার প্রয়োজন। এ সিস্টগুলো কতটুকু ক্ষতিকর তা এগুলোর আকার, আকৃতি এবং মাসিক ও মেনোপজের  বৈশিষ্ঠের উপর নির্ভর করে।

উত্তর: সাধারণত মাসিক হচ্ছে এমন অল্পবয়স্ক মেয়েদের ডিম্বাশয়ে সিস্ট হয়ে থাকে। এটি মাসিকের মাঝামাঝি সময়ে হয়ে থাকে। কোনো ধরনের উপসর্গ ছাড়াই অনেকের ডিম্বাশয়ে ক্ষুদ্রাকারের সিস্ট থাকতে পারে। আবার অনেকের তলপেটের ডান বা বাম পাশে হঠাৎ ব্যাথা হতে পারে। অনেকের খিঁচুনীর মত যন্ত্রনা অনুভূত হতে পারে। সিস্ট বড় হতে শুরু করলে অন্যান্য লক্ষণও দেখা দিতে পারে, যেমনঃ সিস্ট বেশি বড় হয়ে গেলে তলপেট ফুলে যায়।

হেলথ টিপস্‌

ডিম্বাশয়ে সিস্ট প্রতিরোধের কোনো নির্ধারিত বা নির্দিষ্ট উপায় নেই। তবে নিয়মিত Pelvic টেস্টের সাহায্যে ডিম্বাশয়ের যেকোনো ধরণের পরিবর্তন সনাক্ত করা সম্ভব। একই সাথে মাসিকের ক্ষেত্রে কোনো পরিবর্তন দেখা দিলে অবশ্যই যত দ্রুত সম্ভব ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে।

বিশেষজ্ঞ ডাক্তার

ডাঃ মেসাম্মৎ আমিনা বেগম(রেখা)

গাইনি ও অবসটেট্রিক্স ( Obstetrics & Gynaecology)

এমবিবিএস(ঢাকা), এফসিপিএস(গাইনী এন্ড অবস্‌), এমআরসিওজি(ফাইনাল পার্ট)

ডাঃ রওশন আরা বেগম

গাইনি ও অবসটেট্রিক্স ( Obstetrics & Gynaecology)

এমবিবিএস,(ডিএমসি), এমসিপিএস, , এফসিপিএস(গাইনী ও অব্‌স)

অধ্যাপক ডাঃ সাঈবা আক্তার

গাইনি ও অবসটেট্রিক্স ( Obstetrics & Gynaecology)

এমবিবিএস, এফসিপিএস(গাইনী), এফআইসিএম সিএইচ(ভারত), ডিআরএইচ(ইউকে), এফসিপিএস(পাকিস্তান), এফআরসিওজি(ইংল্যান্ড)

ডাঃ আঞ্জুমান আরা

গাইনি ও অবসটেট্রিক্স ( Obstetrics & Gynaecology)

এমবিবিএস, ডিজিও, এমসিপিএস(গাইনী)

ডাঃ আফরোজা কুতুবী

গাইনি ও অবসটেট্রিক্স ( Obstetrics & Gynaecology)

এমবিবিএস, এফসিপিএস (গাইনী এন্ড অবস)

অধ্যাপক ডাঃ রওশন আরা খানম

গাইনি ও অবসটেট্রিক্স ( Obstetrics & Gynaecology)

এমবিবিএস, এমএস (গাইনী), এস মেড

ডাঃ রোকসানা আইভি

গাইনি ও অবসটেট্রিক্স ( Obstetrics & Gynaecology)

এমবিবিএস, এফসিপিএস, এমএস

ডাঃ শাহানাজ বেগম নাজ

গাইনি ও অবসটেট্রিক্স ( Obstetrics & Gynaecology)

এমবিবিএস, ডিজিও, এফসিপিএস(গাইনী এন্ড অবস)