মাসিকের সময় অনিয়মিত রক্তক্ষরণ (Irregular Menstrual flow)

শেয়ার করুন

বর্ণনা

অধিকাংশ মহিলারই বছরে ১১-১৩ বার মাসিক হয়ে থাকে। তবে ব্যক্তিভেদে এটি বেশি বা কমও হতে পারে। তাই কোনো মহিলার মাসিক অনিয়মিত কি না তা তার স্বাভাবিক মাসিক চক্রের উপর নির্ভর করে। সাধারণত প্রথমবার মাসিক শুরু হওয়ার পর দেহে হরমোনগত বিভিন্ন পরিবর্তন আসে। যার ফলে প্রথম কয়েক বছর পর্যন্ত মাসিক অনিয়মিত হতে পারে।

তবে মাসিক বন্ধ হওয়ার পূর্বাবস্থায় মাসিক অনিয়মিত হতে পারে। অধিকাংশ মহিলাই এটিকে মেনোপজ শুরু হওয়ার পূর্বলক্ষণ হিসেবে বিবেচনা করে থাকে। গর্ভধারণের কারণে মাসিক অনিয়মিত হতে পারে। তবে এ ব্যাপারে নিশ্চিত হতে অবশ্যই ব্যক্তি সন্তান-সম্ভবা কি না তা পরীক্ষা করে নিতে হবে।

কারণ

বিভিন্ন কারণে এই লক্ষণ দেখা যেতে পারেঃ যেমন-   

  • সন্তান-সম্ভাবা হলে এবং সন্তান জন্মের পর শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ালে মাসিকের সময় অনিয়মিত রক্তক্ষরণ হতে পারে।
  • খাদ্যাভাসে ত্রুটি যেমনঃ ক্ষুধামন্দার কারনে এই সমস্যা হয়ে থাকে। আবার ওজন অতিরিক্ত কমে গেলে ও অতিরিক্ত অনুশীলনের কারণে এটি হতে পারে।
  • পলিসিস্টিক ওভারিয়ান সিন্ড্রোম বা পি-সি-ও-এস (PCOS) হলো একটি হরমোনজনিত ব্যাধি বা ত্রুটি। এ অবস্থায় ডিম্বাশয়ে ক্ষুদ্রাকৃতির সিস্ট দেখা দেয়। যার ফলে এ রোগে আক্রান্ত হলে মহিলাদের মাসিকের সময় অনিয়মিত রক্তক্ষরণ হয়ে থাকে।
  • অপরিণত অবস্থায় ডিম্বাশয়ের কার্যকারিতা নষ্ট হয়ে গেলে একজন মহিলার দীর্ঘসময়ের জন্য এই সমস্যার সম্মুখীন হয়। এ অবস্থায় একজন মহিলার ৪০ বছর বয়সের পূর্বেই ডিম্বাশয়ের স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা হ্রাস পেতে থাকে।
  • পেল্ভিক ইনফ্লামেটরি ডিজিজ বা পি-আই-ডি (PID) তে আক্রান্ত হলে মহিলাদের জননেন্দ্রিয়ে ইনফেকশন হয় যার ফলে এই সমস্যা দেখা দেয়।
  • ইউটেরিন ফাইব্রয়েডস (Uterine fibroids) হলো জরায়ুর এক প্রকারের টিউমার। তবে এই টিউমার ক্যান্সার সৃষ্টি করে না। জরায়ুতে টিউমার হলে মাসিকের সময় অনিয়মিত রক্তক্ষরণ হয়।

সংশ্লিষ্ট লক্ষণসমূহ

এই লক্ষণের সাথে অন্যান্য যেসকল লক্ষণ দেখা যেতে পারে সেগুলো হলোঃ

ঝুঁকিপূর্ণ বিষয়

মাসিকের সময় অনিয়মিত রক্তক্ষরণের ক্ষেত্রে বয়স সক্রিয় ভূমিকা পালন করে। যেমনঃ যেসব মেয়ের অল্পবয়সে সাধারণত এগার বছর বয়সেই মাসিক শুরু হয়ে যায় তার পরবর্তীতে মাসিক চলাকালীন সময়ে তীব্র ব্যথা হয়ে থাকে। একই সাথে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় বেশি সময়ের জন্য মাসিক স্থায়ী হয়। বিশ থেকে নব্বই শতাংশ মেয়েদের মাসিকের সময় ব্যথা হয় এবং পনের শতাংশের তীব্র ব্যথা হয়ে থাকে। মেনোপজের পূর্বে বা পেরিমেনোপজ পর্যায়ে মাসিক অনিয়মিত হতে পারে। আবার একই সাথে মাসিকের সময় অতিরিক্ত রক্তপাতও হতে পারে। এছাড়াও অন্যান্য যেসকল কারণে মাসিকের সময় অনিয়মিত রক্তক্ষরণ হওয়ার ঝুঁকি বৃদ্ধি পায় সেগুলো হলোঃ

  • অতিরিক্ত মেদ বৃদ্ধি
  • ধূমপান ও অ্যালকোহলের ব্যবহার
  • দুশ্চিন্তা ও মানসিক চাপ
  • বেশ কয়েকবার সন্তান প্রসব করেছেন এমন মহিলার ক্ষেত্রে মাসিকের সময় অধিক রক্তপাত হতে পারে। আবার একবারও সন্তান জন্ম দেননি এমন মহিলাদের মাসিকের সময় তীব্র ব্যথা হতে পারে।

যারা ঝুঁকির মধ্যে আছে

লিঙ্গঃ মহিলাদের মধ্যে এই রোগ নির্ণয়ের গড়পড়তা সম্ভাবনা রয়েছে।

জাতিঃ হিস্প্যানিকদের মধ্যে এই লক্ষণ দেখা দেওয়ার সম্ভাবনা ২ গুণ বেশি। কৃষ্ণাঙ্গদের মধ্যে এই লক্ষণ দেখা দেওয়ার সম্ভাবনা ১২ গুণ কম। অন্যান্য জাতিদের মধ্যে এই লক্ষণ দেখা দেওয়ার সম্ভাবনা ৩ গুণ কম।

সাধারণ জিজ্ঞাসা

উত্তরঃ আমরা যখন কোনো কারনে দুশ্চিন্তা করি তখন এড্রিনাল গ্রন্থি থেকে কর্টিসল নামক হরমোন নিঃসরণ হতে থাকে। এই কর্টিসল হরমোন এস্ট্রোজেন, প্রোজেস্টেরন ও ডি-এইচ-ই-এ (DHEA) নামক যৌন হরমোনকে প্রভাবিত করে যার ফলে মাসিকের সময় অনিয়মিত রক্তক্ষরণ হয়ে থাকে।

উত্তরঃ নিম্নলিখিত সমস্যাগুলো দেখা দিলে চিকিৎসকে পরামর্শ নেওয়া উচিত। যেমনঃ

  • মাসিক চলাকালীন সময়ে তীব্র ব্যথা হলে
  • স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি রক্তপাত হলে বা জমাট বাধা রক্ত গেলে।
  • যোনিপথে স্রাবের সাথে দুর্গন্ধ থাকলে।
  • তীব্র জ্বর হলে।
  • সাত দিনের বেশি সময় ধরে মাসিক হলে
  • মাসিকের সময় বা মেনোপজের পর যোনিপথে রক্ত দেখা গেলে।
  • মাসিক আগে নিয়মিত হলেও তা লক্ষয়ণীয়ভাবে এখন অনিয়মিত হয়ে পড়লে
  • মাসিকের সময় বমি বমি ভাব বা বমি হলে।
  • দীর্ঘ সময় ধরে একটি তুলার প্যাড ব্যবহার করলে, তুলার রক্ত বা ক্লোরিন অথবা রেয়ন জাতীয় তুলা থেকে অ্যালার্জি জনিত কারণে বিভিন্ন সমস্যা দেখা দেয় (১০২ ডিগ্রীর উপর জ্বর, বমি, মূর্চ্ছা যাওয়া বা মাথা ঝিম ঝিম করা) যা টক্সিক শক সিন্ড্রোম নামে পরিচিত।

হেলথ টিপস্‌

জন্মবিরতিকরণ পিল ব্যবহারের সাহায্যে মাসিক নিয়মিত রাখা যায়। তাই যেসব মহিলা জন্মবিরতিকরণ পিল ব্যবহার করে থাকেন তাদের এটি বন্ধ করা উচিত নয়। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এ সমস্যার প্রতিরোধ করার কোনো ব্যবস্থা নেই।

ক্যালেন্ডার অথবা ডায়েরীতে মাসিক শুরু বা শেষ হবার তারিখ এবং মাসিক পূর্ব উপসর্গগুলো লিখে রাখতে হবে, যাতে যেকোনো অস্বাভাবিকতা খুব সহজে বোঝা যায়। মাসিকের সময় সুষম ও স্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণ করতে হবে ও প্রতিদিন প্রচুর পরিমাণ পানি পান করতে হবে। এছাড়াও রক্তপাত বেশি হলে পর্যাপ্ত পরিমাণ বিশ্রাম নিতে হবে এবং প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।